পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টার পরে কড়াইল বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে
স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা
রাজধানীর অন্যতম বৃহত্তম অনানুষ্ঠানিক বসতি কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ ঘণ্টার টানা চেষ্টার পর অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। মঙ্গলবার রাতের এই অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই হাজারো মানুষের জীবন ভেস্তে দেয়। কয়েক ঘণ্টার আগুনের লেলিহান শিখা পুড়িয়ে দেয় শত শত ঘরবাড়ি, দোকানপাট, গৃহস্থালি সামগ্রী ও বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা মানুষের ক্ষুদ্র ব্যবসা।
অতিরিক্ত ভিড়, বস্তির টিন-কাঠের ঘর, সরু গলি, পানির সংকট—সব মিলিয়ে আগুন নেভাতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর নিশ্চিত না হলেও বহু মানুষ আহত ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়েছেন। আগুনে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগুন লাগার সময় ও প্রাথমিক পরিস্থিতি
স্থানীয়দের বর্ণনায় জানা যায়, রাত আনুমানিক ৮টা ১০ মিনিটে বস্তির দক্ষিণ পাশের একটি টিনশেড ঘরে প্রথম ধোঁয়া দেখা যায়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের ঘরগুলোতে। বস্তির ঘরগুলো বেশিরভাগই কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত সবদিকে ছড়িয়ে যেতে থাকে।
অনেকেই প্রথমে আগুনের তীব্রতা বুঝতে পারেননি। কেউ কেউ ভেবেছিলেন রান্নার চুলার আগুন কিংবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের ছোটখাটো সমস্যা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুনের তীব্রতা বেড়ে গেলে সবাই ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে দৌড়াতে শুরু করেন। বাচ্চা, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী—সবাই ছুটে যায় বস্তির বাইরের খোলা জায়গায়।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন—
“আগুন দেখেই আমরা চিৎকার করি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুরো লাইন আগুনে জ্বলতে থাকে। সবাই শুধু জীবনটা নিয়ে পালিয়েছে। কিছুই নিতে পারিনি।”
ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের টানা অভিযান
ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার জানান, খবর পাওয়ার ৮ মিনিটের মধ্যেই প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পরে একে একে মোট ১৫টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়। কাছেই গুলশান লেক থাকলেও সরাসরি পানি টানার মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় পানির অভাবের সমস্যা দেখা দেয়।
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন—
“বস্তির সরু পথ, মানুষের ভিড় ও কাঁচা ঘরগুলো আগুন ছড়াতে সাহায্য করেছে। গলিগুলো এত সংকীর্ণ যে পানি নিয়ে ভিতরে ঢোকা কঠিন ছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ চেষ্টায় অবশেষে পাঁচ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।”
টানা রাত ৮টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত চলে আগুন নেভানোর অভিযান।
মধ্যরাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার ঘোষণা দেয় ফায়ার সার্ভিস।
কীভাবে আগুন ছড়াল? প্রাথমিক ধারণা
যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ হয়নি, তবে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের প্রাথমিক ধারণা—
বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে—
-
বস্তিতে অবৈধভাবে সংযুক্ত অসংখ্য বৈদ্যুতিক লাইন
-
পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত তার
-
অতিরিক্ত লোড
-
শীতকালে হিটার বা কয়েল ব্যবহার বৃদ্ধি
আগুন লেগেছে কোন ঘর থেকে—তা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন বয়ান পাওয়া যাচ্ছে। কেউ বলছেন, রান্নার চুলা থেকে আগুন লেগেছে। কেউ দাবি করছেন, শিশুদের আতশবাজি বা মশা নিধনের কয়েলের আগুন থেকে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে সঠিক কারণ জানতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।
রাতের আঁধারে হাজারো মানুষ নিঃস্ব
আগুনের ভয়াবহতায় কড়াইল বস্তির অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০টি ঘর পুড়ে গেছে বলে প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে। ঘর ছাড়ানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ জন থাকতে পারে। অনেকেই ঘর হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
একজন নারী, যিনি আগুন লাগার সময় ঘরে তাঁর শিশু নিয়ে ছিলেন, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—
“আমি আর বাচ্চা কোনোমতে দৌড়ে বের হয়েছি। ঘরের সব শেষ। সাজসজ্জার মাল, বাচ্চার কাপড়, আমার স্বামীর রিকশার কাগজ—এক মুহূর্তে শেষ।”
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন—
“আমার ছোট মুদি দোকান ছিল। আগুনে সবকিছু পুড়ে গেছে। প্রায় চার লাখ টাকার মাল ছিল। এখন পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই।”
আহতের সংখ্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা
ফায়ার সার্ভিস নিশ্চিত করেছে যে আগুনে কোনো সরাসরি প্রাণহানি ঘটেনি, যা এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তুলনামূলকভাবে সৌভাগ্যজনক। তবে প্রচুর মানুষ ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। অন্তত ২০–২৫ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন।
ডিএমসিএইচ সূত্র জানায়, কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ ধোঁয়াজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগছেন।
রাতভর আশ্রয়হীন মানুষের মানবিক সংকট
ঘরবাড়ি হারানো মানুষদের অনেকে রাস্তার পাশে, স্কুলের বারান্দায়, বস্তির বাইরে খোলা জায়গায় রাত কাটান। অনেকে ভয়ে আবার ভেতরে ঢুকেননি, কারণ আগুন সম্পূর্ণ নিভেছে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।
একজন বৃদ্ধা বলেন—
“আমার কোনো জায়গা নাই। আমার ছেলে রিকশা চালায়। রাতটা খোলা আকাশের নিচে কাটালাম।”
স্থানীয় কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ছাত্র সংগঠন মধ্যরাতেই পানি, রুটি, বিস্কুট ও কম্বল নিয়ে আসে। শিশুরা ঠান্ডায় কাঁপছিল।
তাদের এখন সবচেয়ে বড় চাহিদা—খাদ্য, পোশাক, পুনর্বাসন
আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ হিসেবে ইতিমধ্যেই খাদ্যসামগ্রী ও শুকনো খাবার দেওয়া শুরু হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, দ্রুতই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে।
প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন—
“ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি তাদের দ্রুত সাহায্য দেওয়ার।”
টিন, বাঁশ, চট, কম্বল—এসবের ব্যাপক প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
গুলশান এলাকার নিরাপত্তা ঝুঁকি
কড়াইল বস্তির আগুন লাগলে পাশের গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসের কারণে আগুন বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারত। গুলশান লেকের আশেপাশে মানুষের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো।
অনেকেই দূর থেকে মোবাইলে ভিডিও করেন। এলাকাবাসী বলেন—
“আগুনের লেলিহান শিখা খুব দূর থেকেও দেখা যাচ্ছিল। ভয় হচ্ছিল বাতাসের দিকে ছড়িয়ে গেলে বড় বিপদ হতো।”
বারবার কেন আগুন লাগে কড়াইলে?
বাংলাদেশে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিগুলোতে আগুন নতুন ঘটনা নয়। শুধু কড়াইল বস্তিতেই গত কয়েক বছরে ৫–৬ বার বড় ধরনের আগুন লেগেছে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
-
অনিরাপদ বিদ্যুৎ সংযোগ
-
অতিরিক্ত ঘনবসতি
-
অগ্নিনির্বাপণ উপকরণের অভাব
-
পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ
-
সরু গলি
-
দাহ্য বস্তু দিয়ে তৈরি ঘর
একজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন—
“এই এলাকাগুলোতে আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। প্রয়োজন পরিকল্পিত পুনর্বাসন ও অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।”
আগুনের পর সরেজমিনে সরকার ও প্রশাসনের উপস্থিতি
রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তারা, ফায়ার সার্ভিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশ ঘটনাস্থলের চারপাশে ব্যারিকেড দেয়, যাতে লুটপাট বা বিশৃঙ্খলা না ঘটে।
ডিএনসিসি’র কর্মকর্তারা বর্জ্য পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের মুখে মানবতার গল্প
আগুনের ভয়াবহতা যেমন ধ্বংস এনে দিয়েছে, তেমনি মানুষের মধ্যে মানবিকতার উদাহরণও দেখা গেছে।
অনেকে নিজেদের ঘর বাঁচানোর মধ্যে থেকেও অন্যদের সাহায্য করেছেন।
একজন যুবক বলেন—
“আমার ঘরও পুড়েছে, কিন্তু প্রথমে বাচ্চাদের বের করে এনেছি। তাদের না বাঁচালে কী হত?”
এ রকম অসংখ্য মানুষের বীরত্বের গল্প ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।
বস্তিবাসীর ভবিষ্যৎ—নতুন করে শুরু করার চ্যালেঞ্জ
যারা দিনের আয়ে দিনের খাবার জোগান, তাদের জন্য আগুনে ঘর হারানো মানে জীবনের সবকিছু হারানো।
কেউ টিন দিয়ে নতুন ঘর তুলবেন, কেউ অন্যের বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নেবেন।
তবে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—
“আগামীকাল কী খাব?”
একজন রিকশাচালক বলেন—
“রিকশাটা বাইরের রাস্তায় ছিল বলে বেঁচে গেছে। না হলে রিকশাও চলে যেত। যেটুকু ছিল সব পোড়েছে।”
সরকারের ঘোষণা: পুনর্বাসন, ত্রাণ ও তদন্ত
সরকার জানায়—
-
ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি ত্রাণ দেওয়া হবে
-
ঘর পুনর্নির্মাণে সহযোগিতা
-
শিশুদের বিশেষ সহায়তা
-
আগুনের কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি
-
বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তা বিষয়ক নতুন নির্দেশনা
প্রতিবেশী বস্তিগুলোর সতর্কতা
কড়াইল বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলেও আশপাশের সাততলা, ঝিলপার, মধ্যপাড়া—এসব লাইন রাতজুড়ে আতঙ্কে ছিল।
অনেকেই নিজেদের ঘরের পাশে বালতি, পানি, বালু রাখেন।
একজন বলেন—
“পরপর দুইবার আগুন লাগছে। আমরা ভয় নিয়ে ঘুমাই।”
পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে—ফিরছে স্বাভাবিকতা
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভোর পর্যন্ত ঘটনাস্থলে ছিলেন, যাতে আগুন আবার না জ্বলে ওঠে।
সকালে বস্তির ভাঙা, কালো হয়ে যাওয়া ঘরগুলো দেখে বোঝাই যাচ্ছিল আগুন কতটা ভয়াবহ ছিল।
মানুষেরা দিনের আলোতে এসে তাদের পুড়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসস্তূপ ঘেঁটে যা পাওয়া যায় তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল—
পোড়া হাঁড়ি, গলানো বাসন, আধপোড়া কাগজ, ছেঁড়া কাপড়, ভাঙা আলমারি—সবই তাদের ক্ষুদ্র স্মৃতি।
উপসংহার
কড়াইল বস্তির এই আগুন শুধু কয়েকশো ঘর নয়, হাজারো মানুষের আশা, স্বপ্ন ও নিরাপত্তা কেড়ে নিয়েছে। তবুও তারা বেঁচে আছে, আবার নতুন করে ঘর গড়ার প্রস্তুতি চলছে। রাষ্ট্রীয় সাহায্য, নাগরিক উদ্যোগ এবং সমাজের সহযোগিতা পেলে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে—এই আশায় রয়েছে সবাই।
এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল—
নগর পরিকল্পনা, অগ্নি নিরাপত্তা, পুনর্বাসন ও মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই শহরের বস্তিবাসী নিরাপদ নয়।

0 Comments